Email this sample to a friend

সাহস কী?

সাহস হচ্ছে মৃত্যু থেকে ভীত হওয়া, কিন্তু বাঁচার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা।”-জন ওয়েন।

ভয়ের অনুপস্থিতির নাম সাহস নয় বরং সাহস হচ্ছে এই বিচারবোধ যে, ভয়ের চাইতে গুরুত্বপূর্ণ অন্যকিছু আছে।”-এ্যাম্বরোজ রেডমুন।

সাহস হচ্ছে ভয়কে রোধ করা, ভয়ের উপর প্রাধান্য বিস্তার করা। ভয়ের অনুপস্থিতি নয়।”-মার্ক টোয়াইন।

সাহস’ সম্পর্কে মনিষীদের এ উক্তিগুলি আমি পছন্দ করি। এ বক্তব্যগুলি থেকে বোঝা যায় যে, সাহস হচ্ছে ভয় সত্বেও আপনার নিজের কাজে এগিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য। ইংরেজীতে ঈড়ঁৎধমব বা সাহস শব্দটি ল্যাটিন ঈড়ৎব শব্দ থেকে এসেছে যার অর্থ ঐবধৎঃ বা হৃদয়। আমাদের মতে, সাহস বিষয়টি যতটা না আবেগ বা হৃদয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত তার চেয়ে বেশী বুদ্ধির সাথে সম্পর্কযুক্ত। বুদ্ধির ব্যাপরটি মানুষের মস্তিকের অসাধারণ অংশের (যার নাম ‘নিও-কর্টেক্স’) সাথে জড়িত। ‘নিউ-কর্টেক্স’ নামের এই অংশটি শুধুমাত্র মানুষেরই আছে। মস্তিকের এই অংশটি মস্তিকের অপর অংশ যাহা সকল পশু-প্রাণীরই মস্তিকে আছে তা থেকে পৃথক। ‘লিম্বিক ব্রেইন’ নামের মস্তিকের অপর অংশটি (যাহা সকল প্রাণীরই আছে) তাহা আবেগ পরিচালনা করে। আপনার লিম্বিক ব্রেইন বিপদ এবং ভয়ের অনুভূতি প্রদান করে কিন্তু আপনার মস্তিকের ‘নিও-কর্টেক্স’ অংশ যুক্তি দিয়ে যাচাই করতে পারে যে, সেই বিপদ বা ভয়টি সত্যিকারের কোনো বিপদ বা ভয়ের বস্তু কি-না। তাই ভয় হচ্ছে একটি পাশব অনুভূতি অর্থাৎ এটি একটি আদিম, জান্তব, প্রাকৃতিক অনুভুতি। তাই কোনো ব্যাপার বা ঘটনার সাথে সত্যিকারের ভয় বা বিপদের কোনো সংযোগ না থাকলেও যাচাই-বাছাই না করে তাতে প্রথমেই ভয় পাওয়টা একটি আদিম, প্রাকৃতিক এবং স্বাভাবিক অনুভূতি। যেমন, শীতের দিনে পানিতে হাত দিলে চামড়ায় ঠান্ডার অনুভূতি পাওয়া যায় তাই বলে সেই ঠান্ডা পানিতে গোসল করলে কেউ মারা যাবে এমন ভয় অযৌক্তিক। কোনো ব্যাপারে আগেই ভয় পাওয়া বা কাজে না নেমেই অসফলতার চিন্তা করাটিও সেইরকম ব্যাপার। এটি মস্তিকের লিম্বিক অংশের একটি স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ত অনুভূতি। এই অংশটি সব প্রাণীর মস্তিকেই আছে। প্রাকৃতিক ভাবেই সকল প্রাণীর েেত্রই নতুন কিছুর ব্যাপারে ভয় থাকে। প্রত্যেক প্রাণীই নতুন কাজ, নতুন পরিবেশ, নতুন ঘটনার তিকারক দিক থেকে সতর্ক থাকতে চায়। ফলে প্রথমেই সে নতুন কিছুর ব্যাপারে একটি আত্মরামূলক অবস্থান নিতে চায়। তাই সে নতুন কিছুর ব্যাপারে শুরুতেই বাস্তব-অবাস্তব-কল্পিত-অকল্পিত-দুনিয়ার যাবতীয় ভীতিকারক অবস্থার কথা কল্পনা করে নেয়। অবশ্য নতুন কাজ, নতুন পরিবেশ, নতুন ঘটনার ব্যাপারে এই ভয় পাওয়ার বিষয়টি একদিক থেকে উপকারী। নতুন কিছুর ব্যাপারে যাচাই বাছাইবিহীন এই ভয়ের অনুভূতির কারণেই সকল প্রাণী সত্যিকারের বিপদের সময় তাৎণিকভাবে বিপদ থেকে আত্মরা করতে পারে। একারণেই সকল প্রাণীর মস্তিকের ‘লিম্বিক’ অংশটি সবসময় যাচাই বাছাইবিহীন এই ভয়ের অনুভূতি প্রদান করে চলে। এতে প্রাণীর আত্মরার সুবিধা হয়। এ অনুভূতি না থাকলে সব প্রাণীই অসচেতন অবস্থায় যখন তখন শিকারের পাল্লায় পড়ে মারা যেত। কিন্তু অন্য সকল অবোধ প্রাণীর সাথে আপনার তুলনা চলবে কি? আপনি হচ্ছেন মানুষ। জগতের সেরা প্রাণী যারা সভ্যতা নির্মাণ করে, যারা সর্বোচ্চ পাহাড় চূড়া জয় করে, যারা পাখীর চেয়েও দূরন্ত গতিতে আকাশে ওড়ে, যারা মাছের চেয়েও বেশী সাবলীলতায় মহাসমুদ্রের গভীরতায় বিচরণ করে, যারা যাচাই বাছাইবিহীন ভয়ের অনুভূতিকে মস্তিকের ‘নিও-কর্টেক্স’ অংশের দ্বারা যাচাই করে জীবনের পথ চলে, যারা সংকল্পবদ্ধ হলে ভয়কে জয় করে সবকিছু করতে পারে। আপনি হচ্ছেন মানুষ যার মস্তিকে একটি বিশেষ অংশ আছে যা অন্য প্রাণীর নেই। আপনার মস্তিকে আছে অসাধারণ ‘নিও-কর্টেক্স’ যা আপনাকে দেয়া হয়েছে ভয়ের প্রাথমিক ও জান্তব অনুভূতিকে ঝেড়ে ফেলে মানুষের মত আচরণ করতে। তাই আপনার পছন্দনীয় কাজ শুরু করতে যেসব ভয় আপনাকে প্রথমেই পেয়ে বসে তা সত্যি নয়। তা সবই আপনার ব্রেইনের ‘লিম্বিক’ অংশের দেয়া সতর্কতামূলক পাশবিক, জান্তব ও প্রাকৃতিক ভয়। এটা সেই ভয় যখন একটি ইঁদুর খাবারের সন্ধানে গর্ত থেকে প্রথম মুখ বের করে। তারপর চারপাশ দেখে নিয়ে দ্রুত তার খাবার খুঁজে নিয়ে তা খেতে শুরু করে। আপনি কি একটি ইঁদুর না আপনি একজন মানুষ? এই প্রশ্নের সঠিক উত্তরের উপরই আপনার সফলতা নির্ভর করবে। আপনি ইঁদুর হবেন না মানুষ হবেন সে সিদ্ধান্ত আপনাকেই নিতে হবে। আপনি ইঁদুর হয়ে থাকলে ভয়ে ভয়ে চলবেন আর আশপাশের সবকিছু থেকে গা বাঁচিয়ে অন্যদের উচ্ছিষ্ট খাবারটুকু খুঁজে নিয়ে দ্রুত নিরাপদ জায়গায় গিয়ে খাওয়া শুরু করবেন। আর আপনি মানুষ হয়ে থাকলে আপনার ‘লিম্বিক’ পর্যায়ের ভয় বা প্রাথমিক পর্যায়ের ভয়কে আপনার মস্তিকের অসাধারণ ‘নিও-কর্টেক্স’ অংশের দ্বারা যাচাই করে নিয়ে নিজের কাজে দৃঢ়চিত্তে এগিয়ে যাবেন। নতুন কিছু শুরু করার সময় যেসব অসংখ্য অযাচিত ভয় আপনাকে ভর করে আপনার ব্রেইনের ‘নিও-কর্টেক্স’ অংশ ব্যবহার করে আপনি সেসবের বেশীর ভাগই ঝেড়ে ফেলতে পারেন কারণ সে সকল ভয়ের বেশীরভাগই অমূলক, অবাস্তব ও কল্পিত ভয়। কাজেই ভয়কে ঝেড়ে ফেলে অথবা ভয় পাওয়া সত্বেও দৃঢ়সংকল্পে আপন কাজে অগ্রগামী হওয়াই মানুষের মত আচরণ। তাই ভয়কে অনুসরণ না করে বরং ভয়কে ভয়ের জায়গায় রেখেই আপনি আপনার কাজে অগ্রসর হোন। ভয় সত্বেও আপনি যত এগোতে পারেন আপনি ততখানিই মানুষ। আর ভয়কে অনুসরণ করে যতই আপনি ভয় পেতে থাকেন ততই আপনি ইঁদুর কিংম্বা অন্য কোনো নিুশ্রেণীর প্রাণী। এটি কোনো কথার কথা নয়, কোনো আবেগের কথাও নয়। আপনি যতই আপনার ‘লিম্বিক ব্রেইনের’ দেয়া প্রাথমিক ভয় দ্বারা তাড়িত হন ততই আপনি একটি ইঁদুর বা ইতর প্রাণী আর যতই আপনি আপনার ‘নিও-কর্টেক্স ব্রেইন’ ব্যবহার ক'রে সেইসব কল্পিত ভয়কে যাচাই-বাছাই করে নিতে পারেন আপনি ততই মানুষ। অতএব, “আপনি মানুষ হবেন না ইঁদুর হবেন?”- এটা পুরোপুরি একটি বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন। আপনি যখন নতুন কিছুতে ভয় পান তখন আপনি ইঁদুর কিন্তু যখন ভয় পাওয়া সত্বেও কাজে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তখনই আপনি মানুষ। তাই যারা সাহসী ও সফল মানুষ তারা ভয় পান না তা নয়। আপনার মত তাঁরাও ভয় পান কিন্তু তারা ভয়ের সামনে স্তব্ধ হয়ে যান না। আসল ব্যাপার হলো, তারা ভয় পাওয়া সত্বেও এগিয়ে চলেন এবং সফলতা লাভ করেন। সফল মানুষেরা জানেন যে, ইঁদুর হয়ে বাঁচার চাইতে মানুষ হয়ে মরাও ভাল। যদিও ইঁদুরের চাইতে মানুষের বাঁচার সম্ভাবনাই বেশী। তাই আপনি আর একটু সাহস দেখালে সকলের জন্যই তা ভাল হবে। আপনি তা করবেন কি?

Previous Page Next Page Page 1 of 39